৪ ডিসেম্বর, লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত দিবস ৭১’র এ দিনে আত্মসমর্পন করে পাক বাহিনী - pratidinkhobor24.com

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Tuesday, 3 December 2019

৪ ডিসেম্বর, লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত দিবস ৭১’র এ দিনে আত্মসমর্পন করে পাক বাহিনী



নিউজ ডেস্কঃ
 ৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন ভোরে লক্ষ্মীপুর শহরের বাগবাড়িস্থ মিলেশিয়াদের প্রধান ঘাঁটি আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল গুলি বর্ষণের মুখে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় ওই ঘাঁটির দুই শতাধিক রাজকার ও হানাদার সদস্য। এটাই ছিল লক্ষ্মীপুরে হানাদার বিরোধী মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ প্রতিরোধ। ৯ মাসে লক্ষ্মীপুরের রনাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধারা ৩৭টি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। এতে শহীদ হন ৩৫জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এ তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের সূত্রে জানা গেছে।  
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পুরো সময় জুড়ে লক্ষ্মীপুর জেলায় বর্বর পাকিস্তানি হানাদার ও এদেশীয় রাজাকার বাহিনীর হত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের ঘটনায় ত বিত ছিল। অপরদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রতিরোধ্য গেরিলা যুদ্ধ তাদের জন্য আতঙ্কের কারণ ছিলো। ৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে লক্ষ্মীপুর হানাদার ও রাজাকার মুক্ত হয়। 
লক্ষ্মীপুর শহরের মাদাম ব্রীজ, বাগবাড়ি গণকবর, দালাল বাজার গালর্স হাই স্কুল, মডেল হাই স্কুল, মদিন উল্যা চৌধুরী (বটু চৌধুরী) বাড়ি, পিয়ারাপুর বাজার, মান্দারী মসজিদ ও প্রতাপগঞ্জ হাই স্কুল, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা, এল.এম. হাই স্কুল ও ডাকাতিয়া নদীর ঘাট, রামগতির চর কলাকোপা মাদ্রাসা, ওয়াপদা বিল্ডিং, আলেকজান্ডার সিড গোডাউন, কমনগরের হাজিরহাট মসজিদ, করইতলা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন গোডাউন, রামগঞ্জ গোডাউন এলাকা, রামগঞ্জ সরকারী হাই স্কুল, জিন্নাহ হল (জিয়া মার্কেট) ও ডাক বাংলো হানাদার ও রাজাকার ক্যাম্প এবং গণহত্যার কলঙ্কিত স্থান। 
এদিকে, স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে লক্ষ্মীপুর বেগমগঞ্জ সড়কে প্রতাপগঞ্জ হাই স্কুল, মান্দারী মসজিদ, মাদাম ঘাট ও বাগবাড়ি, লক্ষ্মীপুর-রামগঞ্জ সড়কে দালাল বাজার, কাজীর দিঘীর পাড়, কাফিলাতলী, পানপাড়া, মিরগঞ্জ, পদ্মা বাজার, মঠের পুল এবং রামগঞ্জের হাই স্কুল সড়ক ও আঙ্গারপাড়া, লক্ষ্মীপুর- রামগতি সড়কে চর কলাকোপার দেিণ জমিদার হাট সংলগ্ন উত্তরে, করুণানগর, হাজির হাট আলেকজান্ডার এবং রামগতি থানা ও ওয়াপদা বিল্ডিং এলাকা, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা ও এল.এল হাই স্কুল এলাকায় অধিকাংশ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এ সময় হাজার হাজার নিরীহ মানুষ এবং ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শীহদ হন। এছাড়া মুক্তিবাহিনীর হাতে শত শত হানাদার ও রাজাকার নিহত হয়। জেলায় মোট শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১১৪।
৯ মাসের যুদ্ধে লক্ষ্মীপুরের বীর শহীদরা হলেন- মনসুর আহমেদ, রবীন্দ্র কুমার সাহা, আলী আজম, লোকমান মিয়া, জয়নাল আবেদিন, মোহাম্মদ হোসেন, আবদুল বাকির, জহিরুল ইসলাম, আহাম্মদ উল্যাহ, আবদুল মতিন, মাজহারুল মনির সবুজ, চাঁদ মিয়া, নায়েক আবুল হাশেম, মো: মোস্তফা মিয়া, নুর মোহাম্মদ, রুহুল আমিন, আবুল খায়ের, আবদুল হাই, মমিন উল্যা, আবু ছায়েদ, আব্দুল হালিম বাসু, এসএম কামাল, মিরাজ উল্যা, মোঃ আতিক উলাহ, মো. মোস্তফা, ইসমাইল মিয়া, আবদুল্যাহ, আবুল খায়ের ভুতা, সাহাদুলা মেম্বার, আবুল কালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, বেনু মজুমদার, আলী মোহাম্মদ, শহীদ নজরুল ইসলাম, আবদুল রশিদ।
মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আলাপ কালে জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার রফিকুল ইসলাম মাষ্টারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ১ ডিসেম্বর মিলেশিয়াদের বাগবাড়ী ক্যাম্প অনেক দূর থেকে ঘেরাও শুরু করে। প্রবল গুলি বর্ষণ করতে করতে উক্ত ঘাঁটির রাজাকার ও হানাদারদের অবরুদ্ধ রেখে ৩ ডিসেম্বর ঘাঁটির খুব কাছাকাছি ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের শাড়াঁশি আক্রমণের মুখে অসহায় হয়ে যায় তারা। ৪ ডিসেম্বর ভোরে হানাদাররা আত্মসমর্পন শেষে লক্ষ্মীপুর ছেড়ে চলে যায়।
তিনি আরও জানান, যুদ্ধের নয় মাস শহরের বাগবাড়িস্থ বিশাল সারের গুদামটি ছিল লক্ষ্মীপুরে মিলেশিয়াদের প্রধান ঘাঁটি। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী স্থানীয় বাঙ্গালীদের ধরে এনে এখানে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। শেষে এদেরকে সন্নিকটস্থ রহমতখালী খালের উপর মাদামব্রীজে ফায়ার করে হত্যা করে খালে ভাসিয়ে দেয়া হতো লাশ। বাগবাড়ির এই জায়গাটিকে বলা হয় টর্চার সেল। যুদ্ধশেষে এই টর্চার সেল লাগোয়া গণকবর স্থাপিত হলেও সংরণ করা হয়নি মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত মাদাম ব্রীজ এলাকা। ভগ্নদশা নিয়ে পরিত্যাক্ত মাদাম ব্রীজটি মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতনের ত চিহৃ ও স্মৃতি নিয়ে আজও কালের স্বাী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই স্থানটি সংরণ না করে এখানে স্থাপিত হয়েছে গণশৌচাগার। এ নিয়ে নানান সমালোচনার ঝড় ওঠে লক্ষ্মীপুরবাসীর মাঝে। বর্তমানে লক্ষ্মীপুর পৌর কর্তৃপ গণশৌচাগারটি ভেঙ্গে বৈদ্ব্যভূমি হিসেবে সংরণ করে। 
মুক্তিযোদ্ধা আ ও ম শফিক উল্যা সাংবাদিকদের জানান, নভেম্বরের শেষের দিকে রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসায় হানাদারদের ক্যাম্প আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। কমান্ডার হাবিলদার আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে হানাদারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম বাসু শহীদ হন।
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে লক্ষ্মীপুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে তেমন কোন স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তবে শহীদ আব্দুল হালিম বাসু’র নিজ এলাকা সদর উপজেলার বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়নের প্রধান সড়কটি তাঁর নামে নামাকরণ হলেও দীর্ঘদিন সংস্কার নেই সড়কটির। বিজয়র নগর এলাকায় তাঁর নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “বাসু বাজার”। এই বাজার উন্নয়নে সরকারি বেসরকারী কোন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি কখনো।
২৩ সেপ্টেম্বর ২নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এ কে এম আলী হায়দারের নেতৃত্বে তৎকালীন বৃহত্তর নোয়াখালীর বাঁধের হাট এলাকার রাজগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদারদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন মাজহারুল মনির সবুজ।
তাঁর নামানুসারে তাঁর নিজ এলাকা ভবানীগঞ্জের পিয়ারাপুরে “শহীদ মাযহারুল মনির সুবজ উচ্চ বিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে পারিবারিক উদ্যোগে এটি স্থাপিত হয়। পরে এমপিও ভুক্তি পেলেও বিদ্যালয়টির সার্বিক উন্নয়নে সরকারী বিশেষ কোন উদ্যোগ নেই বলে জানা যায়। বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান আশানুরুপ হলেও এখানে অবাকাঠামোগত উন্নয়ন নেই। নেই একটি খেলার মাঠ। রায়পুরে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করা হয়েছে কয়েকটি সড়ক। 
প্রতি বছর ৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর মুক্ত দিবস ঘটা করে কোন সংগঠন পালন না করলেও লক্ষ্মীপুর মুক্তিযোদ্ধা কামান্ড কাউন্সিল দিবসটি পালন উপলে কর্মসূচি গ্রহণ করে।

No comments:

Post a comment

Post Bottom Ad

Pages